চট্টগ্রাম বিএনপি : নেতারা ব্যস্ত পদ-পদবি নিয়ে-সংগঠন উপেক্ষিত

দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঞ্চল চট্টগ্রামে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, দলের দায়িত্বশীলরা কেউ মন্ত্রী, কেউ এমপি, কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদ-পদবি নিয়েই ব্যস্ত। কেউ ভবিষ্যৎ মেয়র হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।  তাদের এই ব্যস্ততায় উপেক্ষিত হচ্ছে সংগঠন ও সাংগঠনিক তৎপরতা।

চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি দীর্ঘদিনেও গঠন করা হয়নি। আহ্বায়ক কমিটিতেই চলছে এই দুই ইউনিটের কার্যক্রম। অন্যদিকে কমিটিবিহীন অবস্থায় বছর পার করছে উত্তর জেলা বিএনপি। ফলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিটে নেতৃত্বের শূন্যতা ও স্থবিরতার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় একদিকে পরিকল্পিতভাবে সাংগঠনিক কর্মকা- পরিচালিত হচ্ছে না, অন্যদিকে দলের বিভিন্ন ইউনিটে ক্ষমতাসীনদের অনুসারী একটি অংশ বেপরোয়া হয়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু দায়িত্বশীলরা এদের লাগাম টেনে ধরার মতো কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এর ফলে সাধারণ মানুষ ও দলের নিরীহ কর্মীদের কাছে নেতৃত্ব নিয়ে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে।

একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দলের অনেক প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কিংবা জেলা পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব নিয়েই বেশি ব্যস্ত। তারা দল গোছানো, নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম তদারকিতে প্রয়োজনীয় সময় দিচ্ছেন না। তাদের মতে, সরকার পরিচালনা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দলই যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে সেই রাজনৈতিক ভিত্তি ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রাজনীতিসংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় একটি দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার সুযোগ নানাভাবে থাকে। নিয়মিত সম্মেলন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি, জবাবদিহিতা ও নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

মহানগর বিএনপি : ২০২৪ সালের ১৩ জুন কেন্দ্র থেকে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল ডা. শাহাদাত হোসেন ও আবুল হাশেম বক্করের নেতৃত্বাধীন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির কমিটি। ওই বছর ৭ জুলাই এরশাদ উল্লাহকে আহ্বায়ক ও নাজিমুর রহমানকে সদস্য সচিব করে আংশিক মহানগর কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। এর তিন মাসের মাথায় ঘোষণা করা হয় ৫৩ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি। ওই বছর ৭ ডিসেম্বর মহানগরীর মেয়াদোত্তীর্ণ ১৫টি থানা ও ৪৩টি ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। পরে ৩৭টি ওয়ার্ডে পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে ত্যাগী, কারা নির্যাতিত ও যোগ্যদের স্থান না দিয়ে ব্যক্তিবিশেষের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি গঠনের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় ওয়ার্ড কমিটি গঠন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ। এরপর থেকে তিনি সংগঠনের দায়িত্বের চেয়ে সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালনে অধিক ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে কমিটির কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব অনেকটা এককভাবে সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান পালন করছেন। কিন্তু এখন তিনিও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যে কারণে সংগঠন গোছানোর চেয়ে নির্বাচনের মাঠ গোছানোর দিকেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাজিমুর রহমান বলেন, আমার কাছে অন্য যে কোনো পদ-পদবির চেয়ে সংগঠনের দায়িত্ব অগ্রাধিকার। যদি দল আমাকে কোথাও প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয় তবেই দলের নেতাকর্মীদের নিয়েই নির্বাচন করব। তিনি জানান, যাচাই-বাছাই করে ওয়ার্ড কমিটি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা পেলে ঘোষণা করা হবে।

দক্ষিণ জেলা বিএনপি : আলোচিত এস আলম গ্রুপের গাড়িকা-ে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন আহ্বায়ক আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন আহ্বায়ক কমিটি। প্রায় পাঁচ মাস কমিটিশূন্য থাকার পর ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইদ্রিস মিয়াকে আহ্বায়ক ও হেলাল উদ্দিনকে সদস্য সচিব করে আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। তিন মাস পর  ৬ মে ঘোষণা করা হয় ৫৪ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যেই আহ্বায়ক কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটির করার কথা। আহ্বায়ক কমিটি ২২ মে জেলার আওতাধীন সব উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত করে দেয়। এরপর থেকে এক বছরের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ চট্টগ্রামের তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির কোনো সাংগঠনিক কমিটি নেই। নেতাকর্মীদের মতে, এভাবে কমিটিবিহীন থাকার কারণে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। কারও ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। জেলা কমিটির নেতাদের বিভিন্ন বলয়ে ভাগ হয়ে পড়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপকর্মে, কিন্তু দেখার কেউ নেই। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে স্বার্থের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন অনেকে। এ নিয়ে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং। এসব কর্মকা-ে সংগঠনের ইমেজ নষ্ট হলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। এসব নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে বিরাজ করছে ক্ষোভ ও হতাশা।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, জেলা আহ্বায়ক কমিটি অনেক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে উপজেলা ও পৌরসভা কমিটির নেতৃত্বের জন্য দলীয় কার্যালয়ে আগ্রহীদের জীবনবৃত্তান্ত জমা নিয়েছিল। তখন সংগঠন গোছানোর এ উদ্যোগে নেতাকর্মীরা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, সংগঠন গোছানোর দিকে কারও কোনো গরজ নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, উপজেলা ও পৌরসভা কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া আমরা শুরু করেছিলাম। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ওই সময় সেটা আর এগোয়নি। খুব শিগগিরই আমরা কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া আবার শুরু করব।

নেতৃত্বহীন উত্তর জেলা : উত্তর জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর নতুন নেতৃত্ব গঠনের অপেক্ষায় রয়েছেন হাজারো নেতাকর্মী। দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় উপজেলা ও পৌর পর্যায়ের অনেক ইউনিটের কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির অন্তর্কোন্দলে সবচেয়ে বেশি খুনোখুনির ঘটনা ঘটেছে উত্তর চট্টগ্রামে। বিশেষ করে রাউজান উপজেলা পরিচিতি পেয়েছে মৃত্যু উপত্যকা হিসেবে। দলীয় সংঘাতের জেরে ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি। এরপর গত এক বছরের বেশি সময় ধরে কমিটিবিহীন অবস্থায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিটটি। সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতার সুযোগে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

দলের যেসব নেতা নতুন কমিটির বড় পদের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে লবিং করেছিলেন এদের মধ্যে কেউ কেউ পদ পেয়েও গেছেন। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার আলমগীর ইতিমধ্যে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আরেক সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন হয়ে গেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি নেতা ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু আহমেদ হাসনাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন একটা জেলা ইউনিট কমিটিবিহীন অবস্থায় থাকলে এর আওতাধীন উপজেলা ও পৌরসভা কমিটিগুলোতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ জন্য দলের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত কমিটি ঘোষণা করা প্রয়োজন।

বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক যা বললেন : বিএনপির রাজনীতির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামে সংগঠনের এমন অগোছালো অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূলত দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আমাদের বেশি ফোকাস ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাই কমিটি গোছানোর কাজ কিছুটা পিছিয়ে গেছে। খুব শিগগিরই আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করব। নেতাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদ-পদবিতে ব্যস্ত হয়ে পড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আছে। সরকারের যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সফলতা-ব্যর্থতার দায়ভার ওই দলের ওপর বর্তাবে। তাই সামগ্রিক স্বার্থেই দলের নেতাদের সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

-দেশ রূপান্তর

More From Author

সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর নতুন শুল্ক কার্যকর করছে যুক্তরাষ্ট্র